নির্বাচনী সৌহার্দ্যের সংলাপে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির অঙ্গীকার ঝালকাঠি-২ আসনের প্রার্থীদের
প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন | জেলার খবর
মো. রাজু খান (ঝালকাঠি) : নির্বাচনী পরিবেশে সৌহার্দ্য ও নীতিনির্ভর রাজনীতির চর্চা জোরদারে ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘নির্বাচনী সৌহার্দ্যের সংলাপ’। মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ) ঝালকাঠি ও ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের যৌথ আয়োজনে শনিবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঝালকাঠি-২ আসনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি মতবিনিময়, পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী ও পেশাজীবী শ্রেণির সমস্যা তুলে ধরা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করা এবং সহিংসতা ও বৈরিতার বদলে যুক্তিভিত্তিক রাজনৈতিক আলোচনা প্রতিষ্ঠা করাই ছিল মূল লক্ষ্য।
সংলাপের বিভিন্ন সেশন পরিচালনা করেন ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. আককাস সিকদার এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের উপপরিচালক দিপু হাফিজুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন এডভোকেসি ফোরামের আহ্বায়ক এডভোকেট শাহাদাৎ হোসেন।
সংলাপে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার প্রতিনিধিদের আগে থেকে রেকর্ড করা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে প্রশ্নকারীরাও সরাসরি উপস্থিত ছিলেন এবং মঞ্চে তাদের রেকর্ড করা বক্তব্যের ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। আবাসন প্রকল্পের অধিবাসী আবদুর রহমান পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পরিবেশ উন্নয়নের পরিকল্পনা জানতে চান। নারী উদ্যোক্তা কবিতা হাওলাদার নারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব ঋণ, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। কাঁসাপিতল শিল্পের প্রতিনিধি অমিত বণিক ঐতিহ্যবাহী ও বিলুপ্তপ্রায় শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা ও বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা জানতে চান। শ্রমিক প্রতিনিধি হৃদয় শেখ শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও জীবনমান উন্নয়নে প্রার্থীদের অবস্থান জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংগঠক ফয়সাল রহমান প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সমাজের মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রার্থীদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জানতে চান।
সংলাপে বক্তব্য দেন বিএনপি প্রার্থীর প্রতিনিধি রেজাউল হক আজিম, এনসিপির আহ্বায়ক মাইনুল ইসলাম মান্না, সিপিবির প্রশান্ত দাস হরি এবং প্রেসক্লাবের সহসভাপতি জিয়াউল হাসান পলাশ, , সাধারণ সম্পাদক আসম মাহমুদুর রহমান পারভেজ নির্বাহী সদস্য আজমীর হোসেন তালুকদার ও সাবেক ভারপ্রপ্ত সভাপতি আল আমিন তালুকদার। তারা বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, ভয়ভীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
বক্তারা বলেন, নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না হলে দুর্নীতি, ঘুষ ও কালোটাকার প্রভাব বাড়ে। তারা অভিযোগ করেন, অনেক প্রার্থীকে এখনই পাওয়া যায় না, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন, ফলে নির্বাচনের পর তাদের পাওয়া যাবে কি না তা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়। এ অবস্থাকে গণতন্ত্রের জন্য নেতিবাচক বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা।
একই সঙ্গে তারা বলেন, নির্বাচনের সময় এক দলের বিরুদ্ধে আরেক দলের ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কাদা ছোড়াছুড়ি রাজনীতির পরিবেশকে নষ্ট করছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে প্রার্থীদের জনসংযোগ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
সংলাপে বিএনপি প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোর প্রতিনিধি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ হোসেন, জামায়াতে ইসলামী ও ১০ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিম এবং গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মাহমুদুল ইসলাম সাগর অংশ নেন।
সংলাপে অংশ নেওয়া ঝালকাঠি-২ আসনের প্রার্থীরা বলেন, নির্বাচিত হলে এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। আধুনিক হাসপাতাল ও মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তারা। প্রার্থীরা আরও বলেন, স্থানীয় শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালুর অঙ্গীকার করেন তারা। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর কথাও তুলে ধরেন।
একই সঙ্গে তারা নির্বাচনী ব্যয় সংকোচন, টেন্ডারবাজি, ঘুষ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। প্রার্থীদের মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিলুপ্তপ্রায় কাঁসা শিল্পসহ স্থানীয় ঐতিহ্য রক্ষায় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও তারা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠান শেষে আয়োজকরা জানান, এ ধরনের সংলাপ নির্বাচনী পরিবেশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
