নবীন-প্রবীন মিশেলে হচ্ছে নতুন মন্ত্রীসভা
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:৫১ অপরাহ্ন | জাতীয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ইতিমধ্যে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে দলটি। এতে দলের সিনিয়র নেতাদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকরাও।
অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, প্রশাসনে গতি আনা, নীতিনির্ধারণে নতুন ভাবনা এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
২০০১-২০০৬ সরকারের সময়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে এবারের মন্ত্রিপরিষদে রাখার কথা ভাবছে বিএনপি। দলীয় সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিএনপির বিগত সময়ে যেসব মন্ত্রণালয় বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল এবং যেসব নেতার 'পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি' রয়েছে, তাদেরকে নতুন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে রাখা হবে।
এদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি, স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খানকে স্পিকার, মির্জা আব্বাসকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, সালাহউদ্দিন আহমেদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।
এছাড়াও মন্ত্রিপরিষদের বিবেচনায় থাকছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। পাশাপাশি দলে স্থায়ী কমিটি ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নতুন মন্ত্রিপরিষদে যুক্ত হচ্ছে একাধিক নতুন মুখ। সম্ভাব্যা কয়েকজন মন্ত্রী পরিষদে রাখা হচ্ছে। এদের মধ্যে রুহুল কবির রিজভীকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় (টেকনোক্র্যাট), চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (টেকনোক্র্যাট), যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্র-বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে বিবেচনায় আছেন।
এছাড়াও স্থায়ী কমিটর সদস্য ড. এ জেড এম জাহিদ হোসেন আলোচনায় আছেন। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় পেতে পারেন।
কয়েক বছর আগেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ফলে নতুন মন্ত্রিপরিষদে থাকছেন যুগপৎ আন্দোলনের একাধিক নেতা।
নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা একসঙ্গে ছিলেন, সরকার গঠন প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা হবে। এদের মধ্যে রয়েছেন ববি হাজ্জাজ, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ ও গণ-অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর। রেজা কিবরিয়াকে অর্থমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় ১২-দলীয় জোট-প্রধান মোস্তফা জামাল হায়দার আলোচনায় রয়েছেন।
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠনের শুরুটা হবে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণের পর মন্ত্রিসভা গঠন শুরু করবেন। নতুন মন্ত্রিসভা কত সদস্যবিশিষ্ট হবে, সেটা নির্ধারণ করবে নির্বাচনে বিজয়ী দল।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং কক্সবাজার-১ আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিএনপি কেমন মন্ত্রিসভা গঠন করতে যাচ্ছে, তা দেখতে দেশবাসীকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই সরকার গঠিত হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের ফলাফল ঘোষণার পর সবার দৃষ্টি ছিল সরকারি গেজেট প্রকাশের দিকে। ইতিমধ্যে সেই গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের আগে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনি ফলাফলের আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করতে হয়। গেজেট প্রকাশের পর রাষ্ট্রপতি সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করবেন। এরপর শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হবে।সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ করতে হবে। এই সময়সীমার হিসাব প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার দিন থেকে নয়, গেজেট প্রকাশের দিন থেকে শুরু হয়। সাধারণত বিদায়ী স্পিকার এই শপথবাক্য পাঠ করান।তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ২ সেপ্টেম্বর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। আগের সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তিনি পদত্যাগ করেননি।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাধারণত স্পিকার নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়ান। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে এই দায়িত্ব পালন করেন ডেপুটি স্পিকার।তিনি বলেন, 'যদি স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার—কেউই উপস্থিত না থাকেন, তবে গেজেট প্রকাশের চতুর্থ দিন থেকে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথবাক্য পাঠ করাবেন।'
ইসি ২৯৭টি আসনের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করেছে। মোট ২৯৯টি আসনে ভোট গ্রহণ হলেও বিজয়ী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে ৬৮ আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এছাড়া এনসিপি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন।
ছোট দলগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও খেলাফত মজলিস একটি করে আসনে জয় পেয়েছে।
ইসির জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক জানান, এবারের নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৫৯.৪৪ শতাংশ। মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৭ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৬৮৪ ভোটার ভোট দিয়েছেন। ২৯৯ আসনে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
গতকাল বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন জানান, গণভোট ও পোস্টাল ব্যালট যুক্ত করার কারণে ফলাফল চূড়ান্ত করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখানে কোনো ধরনের কারচুপি বা অনিয়মের সুযোগ নেই।
