সুন্দরবনঃ বিপন্ন ঝুঁকিতে বিশ্ব ঐতিহ্য
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ন | ভিন্ন খবর
মোঃ নাঈমুর রহমান (খুবি ) :
সুন্দরবন, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল।
রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ইরাবতী ডলফিন বা শুশুকের বাসস্থান এবং বাংলাদেশের গর্ব।
যেটা কিনা আগামী ১০০ বছরের মধ্যে সম্ভবত ডুবে যাবে।আমরা সারা পৃথিবীর মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে,জোটবদ্ধ হয়ে যেভাবে করে তুমুল উদ্দমে পুরো পৃথিবী ডুবিয়ে ফেলার একটা উপক্রম নিয়েছি তার প্রথম শিকার হতে পারে সুন্দরবন।
কেননা, সারা পৃথিবীতে সমুদ্রসীমার উচ্চতা যে হারে বাড়ছে, তারচেয়ে চার গুণ দ্রুততায় সমুদ্রসীমার উচ্চতা বাড়ছে সুন্দরবনে।
যুগের পর যুগ সুন্দরবন হয়ে উঠেছে উপকূলীয় মানুষের ত্রাণকর্তা। কিন্তু সুন্দরবন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর রক্ষকের ভূমিকা পালন করে এলেও আমাদের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম এ বনের জীববৈচিত্র্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। বনবিনাশী অব্যাহত কার্যক্রমের প্রভাবে বন্যপ্রাণীর বহু প্রজাতি এরই মধ্যে বিলুপ্তি হয়েছে। বনের পরিবেশগত মান ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে।এ যেন রক্ষকের প্রতি ভক্ষকের আচরণ!
২০০৭ সালের জলবায় পরিবর্তনবিষয়ক ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদন অনুসারে, একবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে সমুদ্রপূষ্ঠের একটি অংশের উচ্চতা ৪৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। সেখানে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বনের ওপর নানা ধরনের চাপের কারণে সুন্দরবনের ৫ শতাংশ অঞ্চল ধ্বংস হতে পারে। এরই মধ্যে লোহাচারা দ্বীপ ও দক্ষিণ তালপট্রি দ্বীপ সমুদ্রের নিচে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে ঘোড়ামারা দ্বীপও বর্তমানে অর্ধনিমজ্জিত।
প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণেই সুন্দরবন হুমকির মধ্যে পড়ে গেছে। প্রকৃতি সংরক্ষণ-বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন সুন্দরবনকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য' হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যে সুন্দরবনের অবস্থানের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অনেক আগেই বিবৃতি দিয়েছে।এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও মিষ্টি পানির সরবরাহ হ্রাস পেয়ে বনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি তো রয়েছেই।
বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলােমিটার উত্তরে অবস্থিত।সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই কেন্দ্র নির্মাণ সুন্দরবনকে ক্ষতিতে ফেলবে না। অন্যদিকে পরিবেশবাদীরা এ বিষয়ে ঘোর আপত্তি তুলেছে। ইউনেস্কোর ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, যদি এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সচল হয় তাহলে এ ম্যানগ্রােভ বনাঞ্চলের আরো ক্ষতি হওয়ার আশস্কা রয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও দূষণের ফলে বাস্তুরসংস্থানের ঝুঁকি ত্বরান্বিত করবে।
গত চার দশকে (১৯৭৫-২০২০) সুন্দরবনসংলগ্ন কৃষি কার্যক্রম প্রায় ১৭ হাজার ১৭৯ হেক্টর বন ধ্বংস করেছে।চিংড়ি চাষ ধ্বংস করেছে আরা ৭ হাজার ৫৫৪ হেক্টর। কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্যান্য শিল্প প্রকল্প, সুন্দরবনসংলগ্ন ১৫০টিরও বেশি সক্রিয় কারখানা বিশ্বের বৃহত্তম এ ম্যানগ্রােভ বনাঞ্চলকে মারাত্মক বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
এভাবে চলতে থাকলে এ বনাঞ্চল ঘূর্ণিঝড় ও সুনামির মতো দুর্যোগের বিরুদ্ধে তার প্রতিরক্ষামূলক জৈবিক ব্যবস্থা হারিয়ে ফেলবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় মানুষ পড়বে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে। এরই মধ্যে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাওয়া জমির কারণে ছয় হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি হুমকির মধ্যে রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ।
গত দুই দশকে সুন্দেরবনে আগুন লেগেছে অন্তত ২৪ বার, যাতে ৮২ একর বনভূমির গাছপালা পুড়ে গেছে।
অবৈধ নৌযান চলাচল এবং চোরাচালানের রুট হিসেবে সুন্দরবনকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সুন্দরবনে প্রায় ৩২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, আট প্রজাতির উভচর, ৩২০ প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি এবং প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ ছাড়াও অগণিত কীটপতঙ্গ দেখা যায়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স ডিসিপ্লিনের এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদের প্রতি লিটার পানিতে তেলের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১০ দ্শমিক ৮ মিলিগ্রাম।আর এখন তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৬৮ মিলিগ্রামে; যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা হলাে ১০ মিলিগ্রাম। তাছাড়া পানিতে তেলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের জলজ প্রাণী।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাফসান তানভীর বলেন, ‘সুন্দরবনের আশেপাশে কোনও উদ্যোগ নিলেই সেখানে সবার আগে বনের কী ক্ষতি হতে পারে এবং সেই ক্ষতি পূরণে কী কী করতে হবে তা আগেই অগ্রাধিকার দিয়ে ভাবতে হবে। সর্বোপরি সরকারকেই সুন্দরবনের গুরুত্ব বুঝতে হবে। তাহলেই রক্ষা পাবে সুন্দরবন,রক্ষা পাবে উপকূলীয় জনজীবন।’
স্ব-শব্দে নৌযান চলাচল করছে হরহামেশাই।
অথচ গহীন অরণ্যে প্রাণীগুলো শব্দহীন থাকতে চেয়েছিলো। সুন্দরবন আমাদের শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে না; বরং এটি এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যকেও রক্ষা করে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার জোগান দেয় এ বন। এ কারণেই এ অনন্য অরণ্য রক্ষার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে হবে।
তাই আমরা বলি- সুন্দরবন বাঁচাও, আমাদের অস্তিত্ব বাঁচাও,দেশকে বাঁচাও...

